সিলেট বিভাগের সরকারি বিভিন্ন সেক্টরে উন্নয়নের হাওয়া লাগলেও হাওয়া লাগেনি সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে। নানা সমস্যায় জর্জরিত সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল নিজেই যেনো সংক্রমিত। তিনজন ডাক্তার নিয়ে অপ্রতুল সেবায় প্রতিদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে প্রতিষ্ঠানটি। বাহির থেকে ভিতরের পরিবেশ দেখলে এমনটিই মনে হবে যে কারো। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ ৫৪ বছর পরও কোনো সীমানা প্রাচীরই নেই এই প্রতিষ্ঠানটির।
যার কারনে সন্ধ্যা নামলেই হাসপাতালের আশপাশে বসে মাদকসেবীদের আড্ডা। বহিরাগতদের অবাধ যাতায়াতের কারণে রোগীসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া ভূমিখেকোদের দখলে যাওয়ার শঙ্কায়ও ভূগছেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কাটাতারের জোড়াতালির বেড়ায় শূন্য মাঠে দাঁড়িয়ে আছে একটি গেইট।
১৯৬২ সালে নগরীর শাহী ঈদগাহে ৭৫০ শতক ভূমির উপর সিলেট বিভাগের একমাত্র সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালটি স্থাপন করা হয়। প্রায় চার যুগ পার হলেও গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালটি সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো সীমানা প্রচীর। নিরাপত্তা প্রহরী না থাকায় নিরাপত্তা শঙ্কায় থাকেন চিকিৎসক, নার্সসহ সেবা নিতে আসা রোগীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসা কেন্দ্রটিতে একসময় দূর-দূরান্ত থেকে রোগী আসতেন। জেলা শহরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠায় অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছে হাসপাতালটি। অথচ স্পর্শকাতর রোগগুলোর চিকিৎসা দেয়া হয় এখানে। চিকিৎসাসেবা ফ্রি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে হাসপাতালটি বেশ জনপ্রিয়। সিলেট অঞ্চলে হাসপাতালটি ডায়রিয়া হাসপাতাল হিসেবে অধিক পরিচিত।
যদিও সেখানে ডায়রিয়ার বাইরের অন্যান্য রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। ডায়রিয়া, টিটেনাস, হাম, জলাতঙ্কসহ সংক্রামক রোগের চিকিৎসার জন্য তবে, চিকিৎসক স্বল্পতায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে বিভাগের একমাত্র বিশেষায়িত এ হাসপাতালটি। হাসপাতালটিতে ডায়রিয়া, ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, হাম, হুপিংকাশি, গণ্ডমালা, রুবেলা, জলাতঙ্ক, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের চিকিৎসা দেয়া হয়।
২০২৫ সালে হাসপাতালে ২ হাজার ২৫৩ জন আবাসিক রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, হাম, হুপিংকাশি, গণ্ডমালা, রুবেলা, জলাতঙ্ক, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্তরা রয়েছেন। সরজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের প্রধান ফটকের পাশে রোগীরা কাপড় শুকাচ্ছেন। সীমানা প্রাচীর যথোপযুক্ত না হওয়ায় হাসপাতালের আঙিনায় গরু-ছাগল, কুকুর নির্বিঘ্নে চলাফেরা করছে। অনেকটা অরক্ষিত পুরো এলাকা।
পুরনো ভবনের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তারা খসে পড়তে দেখা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের এক কর্মচারী বলেন, ‘ইদানীং সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মাদকসেবীরা। সন্ধ্যা হলেই হাসপাতালের অভ্যন্তরে ঢুকে মাদক সেবন করে তারা। ভয়ে তাদের কিছু বলাও যায় না। রাতে দায়িত্ব পালনকারী নার্স ও স্টাফরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন।’ চিকিৎসক স্বল্পতাও রয়েছে হাসপাতালটিতে। ২০ শয্যার এ হাসপাতালে মঞ্জুরিকৃত পদের সংখ্যা ২১টি। তবে দীর্ঘদিন থেকে এখানে অনেক পদ-ই শূন্য রয়েছে।
রোগীদের সেবা প্রদানের জন্য ২ জন ডাক্তার নিয়েই চলছে সিলেট বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতাল। এছাড়া ঔষধ সংকট, চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, যন্ত্রপাতির অভাবসহ নানা কারণে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ব্যহত হচ্ছে মারাত্মকভাবে। তবে চিকিৎসাসেবা ফ্রি হওয়ায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে হাসপাতালটি অনেক জনপ্রিয়। অনেকের কাছে ডায়রিয়া হাসপাতাল হিসেবে অধিক পরিচিত।
এখানে ডায়রিয়া, ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, হাম, হুপিংকাশি, গন্ডমালা রোগ, রুবেলা, জলাতংক, ডিপথেরিয়াসহ এই ধরণের নানা সংক্রামক রোগের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে। এই মারাত্মক রোগগুলোর সিলেট বিভাগে এটিই একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্র। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য প্রতিদিন ছুটে আসেন আক্রান্ত রোগীরা। খুব কম খরচে ডাক্তারদের ভালো চিকিৎসা মিললেও নানান অবকাঠামোগত ও ব্যবস্থাপনাজনিত বিশেষত লোকবল সঙ্কটে বিপন্ন বিশেষায়িত এই হাসপাতালটি। রোগীদের মতে হাসপাতালটি নিজেই যেন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত।
নানা সমস্যায় জর্জরিত বিশেষায়িত এই হাসপাতালটি সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, হাসপাতালের সীমানা ঘেষেই রাস্তার পাশে পঁচা ময়লা-আবর্জনার স্তুপ। দূর্ঘন্ধের কারণে রোগীদের অসুখের মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। এছাড়া সীমানা প্রাচীর না থাকার কারণে হাসপাতালের আঙিনায় গরু-ছাগল , কুকুর নির্ভিঘ্নে চলাফেরা করছে।
সিলেট সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে রয়েছে জরুরি বিভাগ। এখানে বেশিরভাগ রোগীই আসেন কুকুর, বিড়াল, বাদুড়ের কামড় ডায়রিয়া বা বসন্তে আক্রান্ত হয়ে। ২৪ ঘন্টা রোগী দেখা হয়, এবং খুব কম খরছে চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব এমটা জানালেন এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। হাসপাতাল সূত্রে জানাযায়, হাসপাতালের নিরাপত্তার জন্য কোনো সিকিউরিটি গার্ড নেই।
এছাড়া ধনুষ্ঠংকার, চিকেন পক্স, ডায়রিয়ার মূমুর্ষ রোগীর জন্য নেই কোনো আইসিইউ ব্যবস্থা। নেই চিকিৎসার প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি। হাসপাতালের অবস্থাও বেশ ভালো নেই। ভেতরে এবং বাইরে অনেক জায়গায় প্লাস্টার খসে পড়েছে। এ ব্যাপারে হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. কমলজিৎ রাজকুমার বলেন, এই হাসপাতালটি সিলেট বিভাগের জন্য অনেক গুরুত¦পূর্ণ একটি হাসপাতাল।
এখানে এমন কিছু রোগের প্রতিষেধক ভ্যাকসিন দেয়া হয় যা বিভাগের অন্য কোথাও নেই। এছাড়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সরঞ্জামাদি ও লোকবল সংকটে আমরা নিয়মিত হিমশিম খাচ্ছি। এ ব্যাপারে আমরা উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠিও দিয়েছি। ডা. কমলজিৎ রাজকুমার বলেন, ‘কাগজপত্রে পাঁচজন চিকিৎসক থাকলেও বাস্তবে তা নেই। আমিসহ একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট কোনো রকমে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আরো অন্তত একজন চিকিৎসক পদায়ন করা দরকার। নিরাপত্তাকর্মী না থাকায় ঝুঁকিও রয়েছে।’