সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত অমান্য করে ধানের শীষ প্রতীকের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা আব্দুল কাইয়ুমকে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এতে ত্যাগী নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
জানা গেছে, সম্প্রতি গঠিত সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটিতে সদস্য হিসেবে জায়গা পান আব্দুল কাইয়ুম। অথচ ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত দিরাই পৌরসভা নির্বাচনে তিনি বিএনপির মনোনয়ন না পেয়ে চামচ প্রতীক নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন এবং মাত্র ২৭৮ ভোট পেয়ে জামানত হারান।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আব্দুল কাইয়ুম আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান এবং সবসময় বিএনপির ধানের শীষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তার পরিবারের সদস্যরা এখনো আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন। তার এক ভাতিজা সবশেষ অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছেন এবং আরেকজন পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হয়েছেন।
২০১১ সালের পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার দায়ে আব্দুল কাইয়ুমের ভাই আব্দুল কুদ্দুসকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এমনকি ২০১৬ সালের নির্বাচনেও তিনি দলের প্রার্থীর বিরোধিতা করেন। সবশেষ ২০২০ সালের নির্বাচনেও তিনি দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে ধানের শীষের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন।
আব্দুল কাইয়ুমের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে ২০২০ সালের পৌরসভা নির্বাচনের সময় ‘দিক দিগন্ত’ নামে একটি ফেসবুক পেইজে দেয়া লাইভ সাক্ষাৎকারে। সেখানে তিনি খোলাখুলি আলোচনা করেন তার নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপট ও আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন।
লাইভ সাক্ষাৎকারে উপস্থাপক তাকে প্রশ্ন করেন, “আপনার অনেক আগেই নির্বাচনে আসার কথা ছিল, এত পরে আসার কারণ কী?” উত্তরে কাইয়ুম বলেন, “আমার নির্বাচনে আসার কথা ছিল এটা ঠিকই আছে। বুলবুল সাহেব যখন নির্বাচিত হয়েছিলেন তখন আমি মনোনয়ন পত্র সাবমিট করেছিলাম পরে প্রত্যাহার করেছি গ্রামের স্বার্থে।
.গ্রামের মুরব্বিরা এসে আমাকে ধরে বললেন, বুলবুল সাহেবকে আমরা প্রার্থী করেছি, আপনি এবার বাদ দেন, আগামীতে আপনাকে দিব। পরবর্তীতে (২০১৬ সালে) মোশারফ সাহেব দলীয় প্রতীক পেলেন, আমি পেলাম না, এজন্য নির্বাচনে আসিনি।”
উল্লেখ্য, আজিজুর রহমান বুলবুল দিরাই পৌর আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি এবং ২০১১ সালে আওয়ামী লীগের মেয়রপ্রার্থী হিসেবে মেয়র হন। আর মোশারফ মিয়া ২০১৬ সালে নৌকা প্রতীক নিয়ে মেয়র হন, তিনি দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয়ভাবে একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত।
সাক্ষাৎকারের আরেক অংশে উপস্থাপক প্রশ্ন করেন, “এইবার দলীয় প্রতীক না পেয়েও কেন নির্বাচনে আসলেন?” উত্তরে কাইয়ুম বলেন, “সবাই জানে কেন আসলাম। আমি বিএনপির একজন ফলোয়ার, আমি কোনো পদে নেই। প্রার্থী নির্বাচনে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, অনেককেই। এজন্যই আসলাম।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দিরাই পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির একজন সদস্য বলেন, “যার পুরো পরিবার আওয়ামী লীগ, যিনি ২০২০ সালে গণতন্ত্রের প্রতীক, দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের প্রতীক ধানের শীষের বিরুদ্ধে নির্বাচন করেছেন, তিনি কিভাবে উপজেলা বিএনপির সদস্য হলেন? এমন ব্যক্তিরা বিএনপির দায়িত্বশীল পদে থাকতে পারেন না। যদি জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটি যাচাই-বাছাই করে তালিকা দিতো, তাহলে এমন বিতর্কিত ব্যক্তি কমিটিতে আসতে পারতো না।”
বিএনপি সূত্র জানায়, সম্প্রতি দিরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির এক সভায় আব্দুল কাইয়ুম ১ নং রফিনগর ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে আবু সালেহ মির্জার নাম প্রস্তাব করেন।
এই প্রস্তাবে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক মইন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক, সদস্য আব্দুল রশীদ চৌধুরী ও সুমন মিয়া। তারা অভিযোগ করেন, আবু সালেহ মির্জা আওয়ামী লীগ সদস্য এবং তাকে আওয়ামী লীগের মিছিলে অংশ নিতে দেখা গেছে।
তাদের এই বক্তব্য সমর্থন করে আরও একাধিক সদস্য বলেন, “আবু সালেহ মির্জাকে নৌকার সংসদ সদস্য প্রার্থী আল আমিন চৌধুরীর মতবিনিময় সভায় উপস্থিত থাকার ছবি আমাদের কাছে আছে।”
উপজেলা বিএনপির সবশেষ সভাতেও কাইয়ুম আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট আবু সালেহ মির্জাকে আহবায়ক করার প্রস্তাব দেন। এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিরোধে সভার কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে ইউনিয়ন বিএনপির কমিটি গঠনের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।
উপজেলা বিএনপির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “যিনি কখনো বিএনপির সভায় অংশ নেননি, তাকে কিভাবে ইউনিয়নের আহ্বায়ক হিসেবে পদ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়? মূলত আব্দুল কাইয়ুম নিজে আওয়ামী লীগপন্থী, তাই তার আশেপাশে থাকা আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের দলীয় পদ দিয়ে বিএনপির ত্যাগী নেতাদের বঞ্চিত করছেন। এতে তার ব্যক্তিগত গ্রুপ হয়তো শক্তিশালী হবে, কিন্তু দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে দিরাই উপজেলা বিএনপির আহবায়ক আমির হোসেন বলেন, আব্দুল কাইয়ুম বিগত পৌরসভা নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্ধিতা করেছেন এটি সত্য। তবে তিনি কিভাবে দিরাই উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য হয়েছেন তা আমার জানা নেই, এটি জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ বলতে পারবেন। তবে কোন ইউনিয়নে যদি আওয়ামীলীগ সংশ্লিষ্ট কারো নাম প্রস্তাবিত কমিটিতে চলে আসে তাহলে আমরা তদন্ত করে তাদেরকে বাদ দেব। কোন অবস্থাতেই আওয়ামীলীগের লোকজন কমিটিতে স্থান পাবে না।
ধানের শীষের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করা আব্দুল কাইয়ুমকে কিভাবে উপজেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির সদস্য করা হল- এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এডভোকেট আব্দুল হক বলেন, আব্দুল কাইয়ুমের বিষয়ে বিস্তারিত আমাদের জানা নেই।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন বলেন, কমিটি অনেক আগে হয়েছে, তাই বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না। খোঁজ নিয়ে দেখছি।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিলেট বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির দায়িত্বশীলরা বলতে পারবেন।