সিলেটের দক্ষিণ সুরমার কুশিয়ারা কনভেনশন হলের মালিক আওয়ামীলীগ নেতা হুমায়ুন আহমেদ এবার সিলেট চেম্বারের নির্বাচনের প্রার্থী হয়েছেন। এর আগে তিনি ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের পাতানো সেই নির্বাচনে সিলেট-৩ আসনের এমপি হওয়ার আশায় আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনেন। অবশ্য তিনি আর প্রার্থী হননি, তবে সেই থেকে তাকে ‘ডামি এমপি’ বলে ডাকা হয়। এমপি না হলেও তিনি আওয়ামীলীগের চামচামি করে বেশ নাম ডাক কামিয়েছেন। মুজিব কোর্ট আর সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবী পড়ে নিজে নিজে নেতা সেজেছিলেন। হুমায়ুন আহমেদের আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কেনার পর তার বন্ধু মহলে অভিনন্দনের জোয়ার উঠে।
পরনে মুজিবকোট হাতে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র এ রকম একটি ছবি ফেসবুকে পোষ্ট দিয়ে লেখা ছিল, ‘আলহামদুল্লিাহ! সিলেট-৩ আসন থেকে দক্ষিণ সুরমার কৃতী সন্তান, গরিব-দুখী ও মেহনতি মানুষের নয়নের মণি, তরুণ শিল্পপতি উদ্যোক্তা, তরুণদের আইডল হুমায়ুন আহমদ মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে আসেন। ইনশাআল্লাহ! মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী শেখ হাসিনা হুমায়ুন আহমদকে মনোনয়ন দিয়ে সিলেট-৩ আসন এর দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন।’
গত বছর ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ফ্যাসিবাদী হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে সিলেট আওয়ামীলীগ নেতারাও যার যার মত পালিয়ে যান। সে সময় চাচা আপন জান বাচার মত অবস্থায় পড়েন হুমায়ুন আহমেদ। কোন উপায় না পেয়ে নিজেও আত্মগোপনে চলে যান।
তবে এবার তিনি সিলেটে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন সিলেট চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রির নির্বাচনে প্রার্থিতা নিয়ে জনসম্মুখে এসেছেন। একটি প্যানেলে সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী হয়েছেন হুমায়ুন। তার প্রার্থিতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে চলছে তীব্র সমালোচনা।
সেই সাথে ৪ আগষ্টে সিলেটে সেই ভয়ঙ্কর অস্ত্র (যেটি অতীতে কখনো সিলেটের রাজপথে প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হয়নি) বহনকারি রুহুল আমীন শিপলু ও ছাত্র-জনতার উপর হামলা হুকুমদাতা পলাতক আনোয়ারুজ্জামানের সাথে হুমায়ুন আহমদের ছবি নিয়ে ছাত্র-জনতার মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা যায়, হুমায়ুন আহমদের টাকা উপর ভর করে আরো কয়েকজন এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বিনিময়ে হুমায়ুন আহমদকে শেল্টার দিচ্ছেন। এতে একজন বিএনপি নেতা জড়িত রয়েছেন বলেও সুত্র নিশ্চিত করে।
জানা গেছে, নির্বাচনে দুটো প্যানেল দাখিলের পরই হুমায়ুনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। হুমায়ুন আহমেদ একজন ব্যবসায়ী হলেও তিনি আলোচনায় আসেন সিলেট নগরীর উপকণ্ঠ এলাকা দক্ষিণ সুরমায় সুরম্য কনভেনশন সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে।
তার ঘনিষ্টজনেরা বলেছেন, আওয়ামী লীগকে কনভেনশন হলে সেবা দিয়ে হুমায়ুন সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হয়ে ওঠেছিলেন। সিলেট চেম্বার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুবাদে তিনি আত্মগোপন অবস্থা থেকে জনসম্মুখে আসায় ২০২৪ সালের নির্বাচন কেন্দ্রিক ও আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ের ছবি ফেসবুকে ছড়িয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ছবিটি বেশি ছড়িয়েছে।
ফেসবুক ঘেঁটে দেখা গেছে, ছবিটি ২০২৪ সালের ২৩ মে হুমায়ুনকে ‘ট্যাগ’ করে আপলোড করা। এসব ছবির সঙ্গে নানা মন্তব্য ও লেখা রয়েছে। এরমধ্যে ‘মুশতাক আহমদ চৌধুরী’ আইডি থেকে গত ৬ জুলাই একটি ‘স্ট্যাটাস’ বেশি শেয়ার হয়েছে।
‘কুশিয়ারা কনভেনশন থেকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হুমায়ুনের ডিগবাজি’ শীর্ষক লেখাটি হচ্ছে, ‘সিলেট-৩ (দক্ষিণ সুরমা) আসনের রাজনীতিতে ফের আলোচনায় উঠে এসেছেন কুশিয়ারা কনভেনশন হলের স্বত্বাধিকারী হুমায়ুন। স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী এই ব্যক্তি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। কুশিয়ারা কনভেনশন হল দীর্ঘদিন ধরেই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন বড় সভা-সমাবেশের ভেন্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। 
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন হুমায়ুন। তবে তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতে, অন্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠে নিষ্ক্রিয় থাকলেও হুমায়ুন এখনো সিলেটে সক্রিয়ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এবং অভিযোগ রয়েছে যে তিনি পেট্রোলিয়াম পণ্যের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে একটি সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি সিলেট চেম্বার অব কমার্সের একটি অনির্বাচিত কমিটিতে তার ভাইকে সহ-সভাপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যা ব্যবসায়ী মহলে নানা সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
এতে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশ্নবিদ্ধ একটি পরিবার কীভাবে বারবার নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে জায়গা করে নিচ্ছে? এছাড়াও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে, বিএনপির কিছু নেতাকর্মী হুমায়ুনের প্রতি নীরব সমর্থন জানাচ্ছেন। কেউ কেউ তাকে সুশীল তকমা দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। গোপন একটি সূত্র জানিয়েছে, হুমায়ুন এক স্থানীয় বিএনপি নেতাকে নামমাত্র ভাড়ায় কুশিয়ারা কনভেনশন হলে দলীয় কর্মসূচি আয়োজনের প্রস্তাব দেন। তবে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর হুমায়ুন এখন বিএনপি নেতাদের তৈলমর্দন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন স্হানীয় এক বিএনপি নেতা।
সিলেট চেম্বার সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ নভেম্বর নির্বাচন। ভোটে লড়তে দুটো প্যানেল নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে একটি প্যানেল হচ্ছে ‘সিলেট ব্যবসায়ী ফোরাম’। অন্যটি ‘সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ’। হুমায়ুন সম্মিলিত ব্যবসায়ী পরিষদ থেকে সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে প্রার্থী। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সিলেট চেম্বারের নির্বাচন পরিচালনা বোর্ডে ব্যবসায়ী পরিষদ তাদের প্যানেলের মনোনয়নপত্র দাখিল করে।
প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ, সিনিয়র সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী হুমায়ুন আহমেদ, সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী মাসুম ইফতেখার রসুল শিহাব, অর্ডিনারি শ্রেণি থেকে পরিচালক পদপ্রার্থী আক্তার হোসেন, এনায়েত আহমেদ মনি, মোহাম্মদ সাহিদুল হক সুহেল, মোজাহিদ খাঁনা গুলশান, মো. মাসনুন আকিব বড়ভূইয়া, জুবায়ের আহমদ চৌধুরী সুমন, ডাক্তার নুরুল আলম সিদ্দিকী, ইমতিয়াজ মো. তাহমিন সুবহান, আব্দুল হাফিজ জোয়ারদার তুহিন, মোহাম্মদ এনামুল হক কুটি, মোহাম্মদ তোফায়েল হোসেন কচি, এ এইচ এম মুস্তাকিম চৌধুরী অনি, অ্যাসোসিয়েট পরিচালক প্রার্থী চন্দন সাহা, আব্দুর রহমান, ওমর ফারুক, মো. আবুল কালাম, মশিউর রহমান হাফিজ ও নজরুল ইসলাম।
গত মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সিলেট ব্যবসায়ী ফোরাম প্যানেলের মনোনয়নপত্র দাখিল করে। এ প্যানেলে প্রার্থীরা হচ্ছেন, সভাপতি পদপ্রার্থী এহতাশেমূল হক চৌধুরী, সিনিয়র সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী এনামুল কুদ্দুস চৌধুরী, সহ-সভাপতি পদপ্রার্থী মো. নাফিস জুবায়ের চৌধুরী, অর্ডিনারি শ্রেণি থেকে পরিচালক পদপ্রার্থী আব্দুর রহমান রিপন, মোতাহার হোসেন, আব্দুল হাদি পাবেল, সৈয়দ জাহিদ উদ্দিন, মো. ইমরান হোসাইন, মো. আবুল কালাম, খন্দকার কাওসার আহমদ রবি, শামসুর রহমান কামাল, মো. মাজহারুল হক, মো. নাহিদুর রহমান, কামরুল হামিদ ও আবু সুফিয়ান, অ্যাসোসিয়েট পরিচালক প্রার্থী জিয়াউল হক, মোক্তাদির হোসেন তপাদার, মোহাম্মদ রেহান উদ্দিন, মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল, মো. মামুনুর রশিদ ও দিবাকর দাস ঝোটন।