ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হচ্ছে আগামী বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায়। এর আগের দিন আগামীকাল বুধবার সরকারি দলের (বিএনপি) সংসদীয় দলের সভা ডাকা হয়েছে। সংসদ ভবনে সরকারি দলের সভাকক্ষে সকাল ১১টায় অনুষ্ঠেয় এই সভায় সভাপতিত্ব করবেন সংসদীয় দলের প্রধান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল সোমবার সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সভায় সরকারদলীয় সকল সংসদ সদস্যকে উপস্থিত থাকার জন্য সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি অনুরোধ জানিয়েছেন। বিএনপির সংসদীয় দলের এই সভায় নতুন সংসদের স্পিকার মনোনয়ন করা হতে পারে।
অন্যদিকে, বিএনপি আশা করছে- প্রধান বিরোধীদল জামায়াত তাদের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ডেপুটি স্পিকার পদে দলের কোনো সংসদ সদস্যকে মনোনয়ন দেবে। আর সাড়া না দিলে শেষ পর্যন্ত বিএনপি দলীয় কোনো এমপিকেই ডেপুটি স্পিকার হিসেবে মনোনয়ন দেবে। বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় নতুন স্পিকার মনোনীত করা হলে এবং জামায়াত কাউকে ডেপুটি স্পিকার পদে মনোনয়ন দিলে সেক্ষেত্রে, আগামীকালই নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের নাম জানা যেতে পারে।
স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নিয়ে কৌতুহল:- নতুন সংসদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার কে হচ্ছেন- এনিয়ে সরকারি ও বিরোধীদলসহ রাজনৈতিক অঙ্গনে কৌতুহল বিরাজ করছে। বিএনপি সূত্রে স্পিকার পদে যে কয়জনের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ও ভাইস-চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন অন্যতম।
এছাড়া, এই পদে নতুন করে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং দলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীর নামও শোনা যাচ্ছে। আর জামায়াত যদি ডেপুটি স্পিকার পদে কারো নাম প্রস্তাব না করে সেক্ষেত্রে এই পদে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিএনপি নেতা জয়নুল আবদিন ফারুক ও বরকত উল্যাহ বুলু।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গত ২ মার্চ সাংবাদিকদের জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকারের পদটি প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামকে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদের সমঝোতার প্রতি সম্মান জানিয়ে সংসদে ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে নিয়োগ দেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এজন্য জামায়াতকে নাম ঠিক করতে বলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের দলের পক্ষ থেকে আমরা প্রধান বিরোধী দলকে মৌখিকভাবে ও সাক্ষাতে অফার করেছি, তারা যেন ডেপুটি স্পিকার ঠিক করে। সেটা জাতীয় সংসদে স্পিকার নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে নির্বাচিত হতে পারে। এর দুইদিন পর জামায়াতের নায়েবে আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, বিএনপির এমপিরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি।
বিরোধীদল থেকে তো ডেপুটি স্পিকারের কথা বলা হয়েছে জুলাই সনদে। তাহলে বিএনপিকে আগে সেটা পরিষ্কার করতে হবে। এর জবাবে বিএনপির সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, জামায়াত নেতা ডা. তাহেরের কথা ঠিকই আছে। জুলাই সনদে বলা আছে- সংসদের দুইজন ডেপুটি স্পিকার থাকবেন; একজন সরকারি দলের, আরেকজন বিরোধীদলের।
কিন্তু, আমরা আমাদের ৩১ দফা অনুযায়ী এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সূচনা হিসেবে জামায়াতকে ডেপুটি স্পিকার পদটি অফার করেছি। তারা যদি এতে সাড়া দেয় তাহলে আমরা খুশি হবো।
প্রসঙ্গত, জুলাই জাতীয় সনদ এবং সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছে, সংসদের দুইজন ডেপুটি স্পিকার থাকবেন। তাদের মধ্যে একজন হবেন সরকারি দল থেকে, অন্যজন হবেন প্রধান বিরোধীদল থেকে। এছাড়া, বিএনপির ৩১ দফার মধ্যে বিরোধীদল থেকে ডেপুটি স্পিকার করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
অধিবেশনের শুরুতে সভাপতিত্ব করতে পারেন ড. মোশাররফ:- সাধারণত নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের শুরুতে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার। তার সভাপতিত্বে অধিবেশনের প্রথমে স্পিকার নির্বাচন করা হয়। এরপর স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশনে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হয়ে থাকে। তারপর অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য মূলতবি রাখা হয়। ওই সময়ে সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতির কক্ষে তার কাছে শপথ নেন নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার।
তবে, এবার স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার না থাকায় প্রথম বৈঠক কার সভাপতিত্বে শুরু হবে তা নিয়ে নানা মত দেখা দিয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার কারাবন্দি থাকায় জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম বৈঠক কার সভাপতিত্বে শুরু হবে তা নিয়ে বিকল্প খোঁজা হচ্ছে।
জানা গেছে, সংবিধানের বিকল্প অপশন অনুযায়ী বৃহস্পতিবার অধিবেশনের শুরুতে কিছু সময়ের জন্য বৈঠকে সভাপতিত্ব করতে পারেন বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা ও দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। বিএনপির আগামীকালের সংসদীয় দলের সভায় এই বিষয়টিও ঠিক করা হবে বলে জানা গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার অধিবেশন শুরু হবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে। এরপর প্রথমে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন করা হবে।
পরে ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করবেন। তার সভাপতিত্বে অধিবেশনে নতুন স্পিকার নির্বাচন করবে সংসদ। এরপর কিছু সময়ের জন্য অধিবেশন মুলতবি করা হবে। মুলতবির সময়ে রাষ্ট্রপতির কাছে নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার শপথ গ্রহণ করবেন। নিয়ম অনুযায়ী এরপর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হবে। পরে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদে ভাষণ দেবেন।
সংবিধান কী বলে:- বিদায়ি সংসদের স্পিকার পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার ফৌজদারি মামলায় কারাগারে আটক থাকায় এবিষয়ে প্রচলিত বিধি এবং রীতিনীতির বিকল্প কী হতে পারে তা নিয়ে খোদ সরকারের মধ্যেও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব রয়েছে। সংবিধানের ৭৪(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন।
৭৪(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন। ৭৪(৩) অনুযায়ী স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার উভয় পদ শূন্য হলে রাষ্ট্রপতি একজন সংসদ সদস্যকে স্পিকারের দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনীত করবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত নতুন স্পিকার নির্বাচিত না হন।
চিফ হুইপকে শুভেচ্ছা জানালেন নাহিদ:- এদিকে, গতকাল সংসদ ভবনে সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনির কার্যালয়ে গিয়ে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ ও জামায়াতের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলামও এ সময় ফুল দিয়ে চিফ হুইপকে শুভেচ্ছা জানান।