সিলেট নগরীর জিন্দাবাজারে অবস্থিত ঐতিহাসিক বাংলাদেশ ওভারসীজ সেন্টার মার্কেট ভেঙে ফেলার উদ্যোগকে কেন্দ্র করে চরম অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন দীর্ঘদিনের লিজগ্রহীতারা। প্রায় চার দশক ধরে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ, বারবার স্থায়ী লিজের আশ্বাস এবং আদালতের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে লিজ বাতিল ও উচ্ছেদের সিদ্ধান্তকে তারা বেআইনি, অযৌক্তিক ও মানবিকতাবিরোধী বলে দাবি করেছেন।
জানা যায়, সিলেট অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির বিনিয়োগ ও কেনাকাটার সুবিধার কথা মাথায় রেখে ১৯৭৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর তৎকালীন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ এবং প্রবাসী নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ ওভারসীজ সেন্টার ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়। জেলা প্রশাসনের অনুদানে গঠিত এই রেজিস্টার্ড ট্রাস্টের লক্ষ্য ছিল প্রবাসীদের নিরাপদ বিনিয়োগ, সমস্যা সমাধান, তথ্যসেবা ও আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা।
একই বছরের ২ অক্টোবর ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। নির্মাণ শুরুর পর জেলা প্রশাসক ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজ সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নেন যে ভবনের নিচতলার ১৫টি দোকানকক্ষ প্রবাসী বাংলাদেশি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিকট দীর্ঘ মেয়াদি লিজ দেওয়া হবে এবং এসব দোকান থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার অর্থ দিয়ে ট্রাস্টের কার্যক্রম ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় নির্বাহ করা হবে।
এ লক্ষ্যে নির্মাণকালীন সময় থেকেই বিভিন্ন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হলেও জিন্দাবাজারের এই অংশে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা না থাকায় তখন আগ্রহী বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে ভবনটির উদ্বোধনের পর প্রবাসী ও সিলেটের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের পুনরায় বিনিয়োগের আহ্বান জানানো হয়।
বর্তমান লিজগ্রহীতারা তখন সাড়া দিয়ে নিচতলার দোকানগুলো বরাদ্দ নেন এবং নিজ খরচে দোকানগুলোর অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন, ডেকোরেশন ও ফিনিশিং কাজ সম্পন্ন করেন। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি লিজগ্রহীতাদের সাথে ডিড অব এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরিত হয়, যাতে নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ সাপেক্ষে লিজের শর্তাবলি মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
লিজগ্রহীতারা বিগত ৪২ বছর ধরে নিয়মিত ভাড়া ও ট্যাক্স পরিশোধ করে আসছেন। অভিযোগ উঠেছে, গত কয়েক বছর ধরে লিজগ্রহীতাদের যথাযথ কারণ ছাড়াই উচ্ছেদের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে কোনো স্বাক্ষরবিহীন নোটিশের মাধ্যমে প্রতি বর্গফুট ৮ টাকার স্থলে ১০০ টাকা এবং কোনো কোনো দোকানের ক্ষেত্রে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করে ভাড়া বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়, যা আশপাশের মার্কেটের ভাড়ার তুলনায় প্রায় ১০০ গুণ বেশি।
এরপর ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ভাড়ার প্রসঙ্গ এবং ১০৯তম সভার সর্বসম্মত স্থায়ী লিজ ডিড বাস্তবায়ন না করে হঠাৎ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাঈদা পারভীন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ দাবি করে সব লিজ বাতিল এবং ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের মধ্যে দোকান খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এতে ক্ষতিগ্রস্ত লিজগ্রহীতারা হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি মোহাম্মদ আনওয়ারুল ইসলাম-এর বেঞ্চ জেলা প্রশাসককে শোকজ করে রুল নিশি জারি করেন। রুলে ভবনের অবস্থা নির্ধারণে বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন ছাড়া উচ্ছেদ ও ভবন ভাঙা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না-তা জানতে চাওয়া হয়েছে। রুল নিশি ও শোকজ জারি থাকা সত্ত্বেও দোকান মালিকদের দোকান ছাড়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক পহেলা মার্চ ২০২৬, রবিবার, নিজে মার্কেটে উপস্থিত হয়ে সবাইকে আগামী রমজানের পর সকল দোকান কোঠা খালি করার নির্দেশ দিয়েছেন। লিজগ্রহীতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আকস্মিকভাবে উচ্ছেদ কার্যকর হলে তাদের কোটি কোটি টাকার বিনিয়োগ ভেস্তে যাবে এবং বহু পরিবারের জীবিকা বন্ধ হয়ে যাবে।
লিজগ্রহীতারা ট্রাস্ট্রি বোর্ডের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু তারা জানিয়েছেন যে এ বিষয়ে তাদের করণীয় কিছুই নাই। এমতাবস্থায় লিজগ্রহীতারা বাংলাদেশ সরকার ও প্রশাসনের কাছে মহামান্য আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী দোকান মালিকদের উচ্ছেদ এবং ভবন ভাঙার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার দাবি জানিয়েছেন। এব্যাপারে তারা সর্বস্তরের মানুষের সমর্থন কামনা করছেন।