সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার পূর্ব বীরগাঁও ইউনিয়নের বীরগাঁও এলাকায় পাখিমারা ও রামগুটা জলকরপুঞ্জ জলমহালে ইজারা নীতিমালা ও মৎস্য আইন অমান্য করে সেচপাম্প বসিয়ে জলাশয় শুকিয়ে নির্বিচারে মাছ নিধনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত ইজারাদার হলো বীরগাঁও খালপাড় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ইজারা নীতিমালা উপেক্ষা করে জলাশয় শুকিয়ে মাছ শিকার করায় একদিকে যেমন দেশীয় মাছের বংশ ধ্বংস হচ্ছে, অন্যদিকে হাওরের কৃষিজমি পড়ছে মারাত্মক হুমকির মুখে। জলাশয় থেকে পানি সেচে নেওয়ায় হাওরের শত শত একর বোরো ফসলি জমিতে দেখা দিয়েছে সেচ সংকট। পাশাপাশি ইজারাদারদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন সাধারণ জেলে ও কৃষকরা।
সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, গত প্রায় ১৫ দিন ধরে পাখিমারা ও রামগুটা জলকরপুঞ্জ জলমহাল শুকিয়ে নির্বিচারে মাছ ধরছেন ইজারাদারের লোকজন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতা সাদিকুর রহমান ও তার সহযোগীরা জলমহালে সেচপাম্প বসিয়ে দিনে পানি সেচে এবং রাতে আলো জ্বালিয়ে মাছ ধরছেন। এমনকি বিষ প্রয়োগ করে কাদায় থাকা বাইম মাছও নিধন করা হচ্ছে।
সকালে এক জলাশয় থেকে পানি ছেড়ে দিয়ে অন্য জলাশয় শুকানোর কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। জানা গেছে, প্রায় ১০৭ একর আয়তনের এই জলমহালটি ১৪৩০ থেকে ১৪৩৫ বাংলা পর্যন্ত ছয় বছরের জন্য ইজারা নেয় বীরগাঁও খালপাড় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতি। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছরে একবার কমপক্ষে পাঁচ ফুট পানি রেখে জাল দিয়ে মাছ আহরণের বিধান থাকলেও লিজ নেওয়ার প্রথম বছর থেকেই প্রতি বছর মৎস্য আইন লঙ্ঘন করে মাছ শিকার করা হচ্ছে।
এছাড়া ইজারা নীতিমালা অনুযায়ী মা মাছের অভয়াশ্রম সংরক্ষণ, খনন কাজ ও গাছ লাগানোর কথা থাকলেও এসবের কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, পাখিমারা ও রামগুটা জলকরপুঞ্জ জলমহালটি সমিতির নামে ইজারা হলেও বাস্তবে এর ভোগদখল করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা মিজানুর রহমান ও তার ছেলে সাদিকুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, সমিতির অধিকাংশ সদস্য প্রকৃত জেলে নন; রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তারা জলমহালটি ইজারা নিয়েছেন।
জলমহাল নীতিমালায় হাওরের কৃষকদের জন্য সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও এখানে ঘটছে তার উল্টো চিত্র। ইজারাদারদের দাপটে কৃষিকাজে বাধার মুখে পড়ছেন সাধারণ কৃষকরা। প্রতিবাদ করলেই মামলা ও হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। বীরগাঁও গ্রামের কৃষক মহিবুর রহমান বলেন, আমরা কৃষক, আমাদের কথা কেউ শোনে না।
এই বিল প্রতিবছর শুকানো হয়। এবারও সেচপাম্প বসিয়ে বিল শুকানো হয়েছে। ফলে আমরা সেচের জন্য পানি পাচ্ছি না। পানি নিতে গেলে ইজারাদারের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করে। আরেক কৃষক ওয়াসিম রায়মন বলেন, আগেও অনেকেই লিজ নিয়ে মাছ ধরেছে, কিন্তু এমনটা করেনি। এরা শুরু থেকেই সমস্যা করছে। আমরা চাই প্রশাসন দ্রুত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে বীরগাঁও খালপাড় মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ আহমদ ও যুবলীগ কর্মী সাদিকুর রহমানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা ফোনকল রিসিভ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা কামরুল হাসান বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর আমি সরেজমিনে জলমহাল এলাকায় গিয়েছি।
ইজারাদারকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেচপাম্প বসালে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার কোনো বিধান নেই। এ ধরনের কর্মকান্ডে ইজারা বাতিল হতে পারে। শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, বিষয়টি জানার পর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে সরেজমিন তদন্তে পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।