সোমবার, ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

ব্যাটারি চালিত রিকশা, নগর জীবনের অদৃশ্য মৃত্যুঘণ্টা

আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৯০ বার পড়া হয়েছে

ব্যাটারি চালিত রিকশা আজ সিলেট নগর জীবনের জন্য অদৃশ্য মৃত্যুঘণ্টা হয়ে উঠেছে। সড়কে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনায় অসংখ্য পরিবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে, আর এ বিপর্যয়ের অন্যতম উৎস এই ব্যাটারি চালিত রিকশা। যেগুলোর নেই চালকদের কোনো প্রশিক্ষণ, নেই বৈধ লাইসেন্স, নেই সড়ক নিয়মের ন্যূনতম ধারণা, যানবাহনে নেই মানসম্মত ব্রেক, সিগন্যাল বা ফিটনেস। এর ফলে শিশু, বৃদ্ধ, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী কেউই রক্ষা পাচ্ছে না। প্রতিটি দুর্ঘটনা মানে একটি পরিবারের বুক খালি হয়ে যাওয়া, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাওয়া।

শুধু দুর্ঘটনাই নয়, এই রিকশাগুলো সিলেট নগরের যানজটকে অসহনীয় পর্যায়ে নিয়ে গেছে। প্রায় ৪০ হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশা শহরের সড়কে যুক্ত হয়ে অফিসগামী মানুষের ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা, স্কুলগামী শিশুদের দেরিতে পৌঁছানো, রোগীকে হাসপাতালে নিতে বিলম্ব এবং উৎপাদনশীল সময় নষ্ট করছে। ফলে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা বলছে, ঢাকায় যানজটে প্রতিদিন ৩.২ মিলিয়ন কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, সিলেটও সেই একই পথে হাঁটছে।

শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ সংকটও তীব্রতর করছে এই রিকশাগুলো। ৩ লাখ পরিবারের জন্য বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যেখানে চ্যালেঞ্জ, সেখানে ৪০ হাজার ব্যাটারি চালিত রিকশা প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ খরচ করছে। একটি রিকশা চার্জ দিতে যে বিদ্যুৎ খরচ হয়, তা দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৫০ হাজার পরিবারে আলো জ্বলতে পারত।

অথচ আমাদের সন্তানেরা যখন পড়ার টেবিলে অন্ধকারে বসে থাকে, সেই বিদ্যুৎ রিকশার চাকায় পুড়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে বিষাক্ত সীসা দূষণের কারণে। প্রতিটি ব্যাটারির ভেতরে থাকা সীসা মানুষের স্নায়ুতন্ত্র ধ্বংস করছে, শিশুদের মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ব্যাহত করছে, গর্ভবতী নারীর গর্ভস্থ শিশুর বিকাশে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। নষ্ট ব্যাটারি ডোবা খালে ফেলায় মাটি, পানি ও খাদ্য প্রতিদিন বিষাক্ত হয়ে পড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানসিক চাপ।

যানজটে দীর্ঘ সময় আটকে থেকে মানুষের হতাশা বাড়ছে, অগোছালো চলাচলে বিরক্তি বাড়ছে, সামাজিক অশান্তি তৈরি হচ্ছে। গবেষণা বলছে, দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকা মানুষের মধ্যে ডিপ্রেশনের হার প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। এছাড়া গর্ভকালীন সময়ে সীসা রক্তের মাধ্যমে ভ্রূণের শরীরে প্রবেশ করে, জন্মগত ত্রুটি ও মৃত সন্তান জন্মের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে আগামী প্রজন্ম জন্মের আগেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। আইনগত দিক থেকেও ব্যাটারি রিকশা বৈধ নয়।

সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী অবৈধ যানবাহন চলতে পারে না। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী সীসা দূষণ দণ্ডনীয় অপরাধ। বিদ্যুৎ আইন অনুযায়ী, অবৈধ ভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অর্থাৎ সামাজিক ক্ষতির পাশাপাশি আইনগতভাবেও ব্যাটারি রিকশা নিষিদ্ধ। সমাধান অবশ্যই আছে। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালু করতে হবে, শহরে সাইকেল ও পথচারীবান্ধব উদ্যোগ নিতে হবে, আধুনিক ও উন্নতমানের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে বিষয়টি প্রশাসনিক নয়, মানবিক। আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। আজ আমি পুলিশ কমিশনার হিসেবে নয়, একজন বাবা, একজন নাগরিক হিসেবে আবেদন করছি- আপনার সন্তানকে ভালোবাসলে ব্যাটারি রিকশার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। আপনার সাময়িক সুবিধা হয়তো কমে যাবে, কিন্তু শহর বাঁচবে, পরিবেশ বাঁচবে, প্রজন্ম বাঁচবে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ ইতিমধ্যে ব্যাটারি রিকশা বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক নয়, মানবিক সিদ্ধান্ত। আমরা চাই না, সিলেটের মানুষ ব্যাটারি রিকশার বিষাক্ত চাকায় পিষ্ট হোক। তাই আসুন শপথ করি- ব্যাটারি রিকশা আর নয়, নিরাপদ সড়ক চাই, সুস্থ পরিবেশ চাই, আলোকিত প্রজন্ম চাই, সিলেট হোক শান্তির, সৌন্দর্যের, নিরাপত্তার নগর। 

লেখক: আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, পিপিএম, এসএমপি কমিশনার, অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত।

এ বিভাগের আরো সংবাদ
©2020-2025 All rights reserved
Design by: POPULAR HOST BD
themesba-lates1749691102
error: Content is protected !!