সিলেটে জ্বালানি তেল নিয়ে রীতিমত চলছে তেলেসমাতি কারবার। ইতোমধ্যে নির্ধারিত কোটা শেষ হওয়ায় ৩/৪টি পাম্পে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আজ মঙ্গলবারের মধ্যে আরো ৩/৪টি পাম্পেও জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ হবে।
এপ্রিলের ১ তারিখ (কাল) নতুন কোটায় সরবরাহ আসলে ফের বিক্রি তেল বিক্রি করবে পাম্পগুলো। এতে সংকট আরো ঘনীভুত হচ্ছে। এদিকে সিলেটে জ্বালানি তেল নিয়ে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। পাম্পগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যুদ্ধংদেহী অবস্থানে সৃষ্টি হচ্ছে আতংক।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জ্বালানি তেলের সংকট নেই বলা হলেও ব্যবসায়ীদের দাবি তেল মিলছে চাহিদার অর্ধেক। চাহিদা বাড়লেও সরবরাহ বৃদ্ধি না হওয়ায় নগরীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পাম্পে তেল বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। আরো কয়েকটিতে তেল বিক্রি বন্ধের উপক্রম। জানা গেছে, প্রশাসনের নানা উদ্যোগেও সিলেটে দূর হচ্ছেনা জ্বালানি সংকট।
এদিকে সরকারের অন্তত ১২টি প্রতিষ্ঠানের কাছে জ্বালানি তেলের চাহিদার হিসেব দিতে দিতে বিরক্ত পাম্প মালিক কর্তৃপক্ষ। অথচ রাষ্ট্রীয় বিপণন প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সরবরাহের সঠিক তথ্য রয়েছে। মোটরসাইকেলের তেল নিতে গাড়ীর রেজিস্ট্রেশনের পাশাপাশি ও ড্রাইভিং লাইসেন্স বাধ্যতামুলক করায় অনেকেই অবৈধভাবে তেল সরবরাহ করতে গিয়ে নানামুখী ঝামেলার সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে জ্বালানি তেল কিনতে প্রশাসনের কাছ থেকে ফুয়েল কার্ড সংগ্রহের নামে ভোগান্তিতে পড়েছেন অনেক বাইক চালক। তারা অবৈধভাবে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটে জ্বালানি তেল সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের ভিন্নমুখী বক্তব্যে বাস্তব চিত্র আড়াল হচ্ছে এবং তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।
প্রশাসনের দাবি জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই, কিছু অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। অন্যদিকে পেট্রোল পাম্প মালিক ও ডিলারদের অভিযোগ চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ না পাওয়ায় বাস্তবেই সংকট তৈরি হয়েছে। এদিকে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিলেট মহানগর পুলিশের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী বলেন, জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। বরং ভুল তথ্য, গুজব এবং কিছুক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে সংকটের ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে এবং পাম্পগুলোতে অপ্রয়োজনীয় ভিড় তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, তেল আছে, কিন্তু কেউ যদি বলে তেল নেই, তখন মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এতে করে হাঙ্গামা তৈরি হয় এবং শেষ পর্যন্ত দায়টা সরকারের ওপর পড়ে।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে, তবে সরকারের আন্তরিকতা ও বাস্তব চিত্র সঠিকভাবে জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে কয়েকটি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। মোটরসাইকেলে জ্বালানি নিতে হলে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স, নিবন্ধিত যানবাহন এবং চালকের হেলমেট পরিধান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে নগরের ৩৮টি পেট্রোল পাম্পে দিন-রাত মিলিয়ে প্রায় ১৫০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ কমিশনার জানান, ডিপো থেকে পাম্পে যাওয়ার পথে তেল চুরি বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এবিষয়ে নজরদারি বাড়াতে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। মাঝপথে তেল সরিয়ে নেওয়া বা মজুদদারি প্রমাণিত হলে বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে প্রশাসনের এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন পেট্রোল পাম্প মালিকরা।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলার্স, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সিলেট বিভাগীয় কমিটির মুখপাত্র ব্যারিস্টার রিয়াসাদ আজিম হক আদনান বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি প্রশাসনের বক্তব্যের সঙ্গে মিলছে না। চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না।
গত বছরের তুলনায় এবার চাহিদা অনেক বেড়েছে, কিন্তু বরাদ্দ সেই অনুপাতে বাড়েনি। ফলে পাম্পগুলোতে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পরিমাণ তেল না পেয়ে পাম্প মালিকদের প্রশাসনের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে। পুলিশ-বিজিবি মোতায়েন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ডিপোতে এমনভাবে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে যেন যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে। এতে মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
নগরী উত্তরা পেট্রোলিয়ামের জেনারেল ম্যানেজার মারুফ আহমেদ জানান, অনেক সময় ধরেন ১০ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন থাকলেও সরবরাহ করা হচ্ছে তার অর্ধেক। অথচ পরিবহন খরচ একই থাকায় তাদের আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। তাছাড়া গ্রাহকের চাহিদা বেশি থাকায় তেল প্রয়োজন অনেক তবুও আমরা সংকট কাটিয়ে উঠে গ্রাহকসেবা অব্যাহত রেখেছি। নগরীর একাধিক পেট্রোল পাম্প মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা চাহিদার অর্ধেক জ্বালানি তেলও পাচ্ছেন না। ফলে গ্রাহকদের চাহিদামতো তেল সরবরাহ সম্ভব হচ্ছেনা।
নগরীর সোবহানীঘাটস্থ গ্যাসোলিন পেট্রোলিয়াম পাম্পের জেনারেল ম্যানেজার শামসুজ্জামান তিতাস জানান, কোটা শেষ হয়ে যাওয়ায় তার পাম্পে পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেন বিক্রি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ১ তারিখ থেকে নতুন কোটায় সরবরাহ পেলে ফের জ্বালানি তেল বিক্রি করা হবে। এ ব্যাপারে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম জানান, সিলেটে জ্বালানি তেলের সরবরাহের কোন ঘাটতি নেই।
কিন্তু পাম্পগুলো অতিরিক্ত বিক্রি করে ফেলায় সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। তাই অনেক পাম্প তাদের মাসের কোটা শেষ করে ফেলায় এখন বিক্রি বন্ধ করেছে। এথেকেও প্রতীয়মান হয় সরবরাহ স্বাভাবিক। তিনি বলেন, সিলেটে ফুয়েল কার্ড চালু করা হয়নি। কিছু সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে দৈনিক জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। সেগুলোতে নির্দিষ্ট পরিমান তেল ড্রামে করে সরবরাহের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি কেউ কেউ অতিরিক্ত তেল মজুদ করেছেন। ইতোমধ্যে সকল পাম্পে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তারা বিষয়গুলো সার্বক্ষণিক মনিটরিং করছেন।